শনিবার ৩১ জুলাই ২০২১

১৫ শ্রাবণ ১৪২৮

ই-পেপার

নিজস্ব প্রতিবেদক

মার্চ ২৩,২০২০, ০১:৪১

সৌন্দ্যর্যর লীলাভূমি সমশেরনগরে একবেলা

টানা দু’দিনের প্রোগ্রাম শেষ করে সিলেট সদর থেকে রওনা হলাম মৌলভীবাজার এর উদ্দেশ্যে। সকাল ১১টায় কদমতলী বাসট্যান্ড থেকে সিটিং সার্ভিস এর দুটো টিকেট কেটে ১৩/১৪ নাম্বার সিটে দু’জন চেপে বসলাম। আমার সফরসঙ্গী ছিলেন পর্বতারোহী/লেখক ইকরামুল হাসান শাকিল। শীতের সকালটা কুয়াশাচ্ছন্ন না হয়ে প্রখর রোদেলা হওয়াতে শরীরটা চিটমিট করছিলো ঠিক সে মুহূর্তে শাকিল ভাই বললেন পানি লাগবে, এইবলে মুদি দোকানে গিয়ে একটা পানির বোতল ও হাল্কা নাস্তা নিয়ে আসলেন। খেতে খেতে বলে দিলেন এটাই কিন্তু সকালের নাস্তা (হাহা)। বেলা সাড়ে এগারোটায় কদমতলী থেকে বাস ছেড়ে দিয়ে মৌলভীবাজারের দিকে ছুটতে লাগল। প্রায় আড়াই ঘন্টা বাস জার্নির সমাপ্তি ঘটলে আমরা মৌলভীবাজার পৌঁছে যাই। ততক্ষনে সূর্যটি মাথার উপরে টনটন করে ঘন্টা বাজিয়ে দিচ্ছে। দুপুর বেলা খাবার সময় হয়ে এসেছে তাই সিলেটের বিখ্যাত সুনামধন্য হোটেল পানসিতে গিয়ে খানাপিনা সেড়ে ফেললাম। এবার পালা সমশেরনগর রওনা দেবার। সিনএনজিতে জনপ্রতি ৫০টাকা করে ভাড়া। প্রথমে একে অপরের দিকে তাকালাম, পরে আলোচনা করে একটি সিএনজিতে বসে পড়লাম যেন পরবর্তীতে বাকবিতন্ডায় জড়াতে না হয়। ইঞ্জিন চালিত সিএনজি চালু হলো এবং সমশেরনগর এর পথ ধরে সামনে এগুতে থাকলো। চালক বলল, কি মামা প্রথম আইছেন নাকি? আমরা হ্যাঁ সম্মতি জানালাম। পাকা রাস্তার যে বেহাল অবস্থা তাতে করে মনে হচ্ছে ২০ কি.মি পথ যেন শেষ হবার নয়। কুচি পাথর আর পিচ ঢালা রাস্তাটার সোলিং একেবারেই নষ্ট হয়ে গেছে, কোথাও আবার সংস্করণের কাজ চলছে।

ছবি: শমসেরনগর যাওয়ার সময়। টিলাগুলো কেটে রাস্তা বানানো হয়েছে।

মাথার উপরের সূর্য খানিকটা বিশ্রাম নিতে গেছে এর মধ্যে আমরা সমশেরনগর রেলস্টেশনে এসে পৌঁছে গেলাম। অপেক্ষা করতে থাকলাম শিরিন আপার জন্য। মিনিট কয়েক পরে তিনি একটি লাল রঙের বাইসাইকেল নিয়ে আমাদের সামনে হাজির হলেন। শাকিল ভাই ও শিরিন আপার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যেমে প্রতিনিয়ত কথা হলেও তাদের এবারই প্রথম মুখোমুখি দেখা। আর এজন্যই একে অপরের সাথে কথা বলতে থাকলেন এবং সামনের পথ ধরে এগুতে থাকলেন, কিছুটা পথ এগিয়ে চার রাস্তার মোড়ে এসে দাড়িয়ে গেলাম, চা বাগান দেখার জন্য একটা রিকশায় উঠে পড়লাম। লেক পাড়ে নাকি কোনো খাবারের দোকান নেই, তাই দোকান থেকে কিছু খাবার সংগ্রহ করলাম।

প্রথমবার হওয়াতে ব্যাটারি চালিত রিকশা যতই দূর এগুচ্ছে কাছের পথটাও যেন ততই দূরে মনে হচ্ছে। ছোট ছোট টিলা কেটে চলাচলের জন্য পাকা সরু রাস্তাটির ব্যবস্থা করা হয়েছে। ডান কিংবা বাম যেদিকে তাকাই না কেন শুধুই চা বাগান। দীর্ঘ পথের ব্যবধানে দু-একটা করে ঘর আর টং দোকান। আমাদের ব্যাটারী চালিত রিকশার সাথে পাল্লা দিয়ে চলছে শিরিন আপার লাল বাইসাইকেল। কখনো উনি সামনে এগিয়ে যাচ্ছে আবার কখনো বা আমাদের ব্যাটারী চালিত রিকশা। চলে এলাম ৫০ শয্যা বিশিষ্ট ক্যামেলিয়া ডানকান হসপিটালের অভিমুখে আর ঠিক এখান থেকেই শুরু চির সবুজের চোখ ধাঁধানো চা বাগানের একাংশ। খোলা এ চোখ দুটো যতদূরই যাচ্ছে ততবারই যেন সীমানা খোঁজার চেষ্টা করছে। চা বাগানের মাঝখান দিয়ে চলে যাওয়া কাঁচা সরু পথটা দিয়ে আমরা রিকশায় করে সামনের দিকে যেতে থাকি। বেশ দূরে গিয়ে আমি ও শাকিল ভাই নেমে গেলাম একটি ব্রিজের উপর।

ছবি: চা বাগানের একটি স্থিরচিত্র।


ছোট ব্রিজ অতিক্রম করে হালকা উচুঁ টিলা আর এর মাঝখান দিয়ে সরু কাচা পথ, আমরা সে পথ দিয়েই লেকের দিকে যেতে থাকি আর নানান ধরনের কথাবার্তায় মাঝেমাঝে হাহা চিৎকার দিয়ে আনন্দ-উল্লাসে মেতে উঠছি। চোখ গেল ক্ষেতের মাঠে বক আার মহিষের বন্ধুত্বের খুনসুটির দিকে, মহিষ আপন মনে ঘাস চিবিয়ে যাচ্ছে আর বক হালকা আচেঁ রোদ পোহাচ্ছে, বক মাঝে মাঝে উড়িয়ে উঠছে। মজার বিষয় হলো শিরিন আপা অনেকটা সময় সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলার কারনে আমার বুঝতে কষ্ট হলেও ভালোই লাগছিলো। ক্যামেলিয়া লেকে যাওয়ার সময় খুব বেশি একটা ছবি তুলি নাই বলায় যায়, কেননা এই নয়নাভিরাম দৃশ্য কি খালি চোখে না দেখে ক্যামেরা বন্দি করলে মানায়। একসময় আমরা পৌঁছে গেলাম ক্যামেলিয়া লেকের ধারে। এখানে একটা কথা পরিষ্কার করা দরকার, এই লেকের নামকরনে কোথায় যেন একটা সমস্যা হয়েছিলো আর সে কারনেই হয়তোবা এটাকে ক্যামেলিয়া লেক আবার কেউবা বিসলারবান বলে চেনেন। সে যাই হোক, নাম যেমনই হোক এমন জায়গা দেশে খুঁজে পাওয়া বড্ড মুশকিল। প্রকৃতির এমন অচেনা শহরে ঘুরতে যাওয়াটা ছিলো আমার জন্য যেমন রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা ঠিক ততটাই হৃদয় জুড়ানো। লেকের ধারে এসে শীতের কাপড়, কাধের ব্যাগ সব আছরে ফেলে দিয়ে দেখতে থাকলাম চারপাশ, জনশূন্য এ মৃত্তিকাগর্ভে কি এক অজানা রহস্য লুকিয়ে আছে। চারপাশ মায়া আর অচেনা গন্ধে ঘিরে আছে চা বাগানটিকে।

এদিকে আবার শাকিল ভাই ও শিরিন আপা গল্পে মেতে উঠেছেন, নেশার ঘোর কাটিয়ে আমিও তাদের সাথে যুক্ত হলাম। কিছুক্ষন পরপর চোখে পড়ছে দু-একজন চা বাগান শ্রমিকদের। আরো খানিকটা সময় পার হতেই কোথা থেকে যেন একঝাক দর্শনার্থীরা ভিড় জমালেন এবং তারা নিজেদের মতো করে আড্ডায় মেতে উঠলেন। শুধু এদিক-ওদিক আমি খুঁজে যাচ্ছিলাম হঠাৎ করেই চোখে পড়লো ঐ দূরের চা বাগানে, মাটির তলানি থেকে চারটি মাথা বের করে পানি ছিটিয়ে চায়ের পাতাগুলোকে সতেজ করে যাচ্ছে মেশিনটি। ইচ্ছে জাগলো ওদিকটাই যাই কিন্তু শিরিন আপা বললেন না ঐদিকটা আমাদের জন্য সুবিধাজনক হবে না তাই মনের ইচ্ছাটা মারা গেলো। চায়ের গাছগুলো ২থেকে ২.৫ফিটের মতো উচু কিন্তু বয়স যে তার বেশ হয়েছে শেখর ও ডালপালা দেখলেই বোঝা যায়। এদিকে শাকিল ভাই আবার আজকের শিরিন হয়ে ওঠার গল্পটা মনোযোগ দিয়ে শুনছেন আপার নিজ মুখ থেকে। পরক্ষনেই আবার শাকিল ভাইকে বললাম- ভাই আমার কিছু ছবি তুলে দেন, সে ক্যামেরাটা হাতে নিয়ে নানান অঙ্গিভঙ্গিতে আমার ছবি তুলে দিলেন।

ছবি: চা বাগানের আগাছা পরিস্কার করে কর্মীর ঘড়ে ফেরার দৃশ্য ক্যামেরা বন্দি করেছেন শাকিল ভাই।


লেকের পাশে ছোট করে একটা ছাউনি আর একটা সিড়ি পার বানিয়ে রেখেছেন ক্যামেলিয়া ডানকান কর্তৃপক্ষ। যেকোন দর্শনার্থী আসলে যেন সিড়িপারে বসে বা দাড়িয়ে এই অপরুপ সৌন্দ্যর্য উপভোগ করতে পারেন। লেকের এপাশ থেকে ওপাশ দেখা যাচ্ছে উচু-নিচু টিলার মাঝে মাঝে ছোট ছোট খুপরির টিনের চালের একটি করে ঘর। আবার বিজিবি দের বেধে দেওয়া সীমানা। ঐদিকে আবার বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে আসার সময় হয়েছে। প্রকৃতির সৌন্দ্যর্যগুলো ঘুমিয়ে পড়ছে। বিলুপ্ত প্রায় অতিথি পাখিগুলোর কলরব ও গুঞ্জনের শব্দ বাড়তে শুরু করছে, তাদের আবাস স্থল খুঁজে নিয়ে বিশ্রামের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। সাথে আবার ঝিঝি পোকাগুলো চিচির মিচির করছে, মন আর কানের পর্দা খুলে দিয়ে বোঝার চেষ্টা করছিলাম তাদের আমন্ত্রনের ভাষা।

ছবি: চা পাতা সংগ্রহ করার পরে চা গাছের একাংশ।


আবারো সেই সরু পথ দিয়ে বাহির হয়ে যাচ্ছি। শেষ মূহুর্তে চোখে পড়ল ৩জন কাঠুরে মিলে লাকড়ি সংগ্রহ করছে। পশ্চিম আকাশের সূর্যটি লালচে আকার ধারণ করছে, পশমওয়ালা ভেড়াগুলো সভ্য জাতির মতো লাইন করে ঘরে ফেরার চেষ্টায় এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে আর সামনের দিকে এগুচ্ছে।

ছবি: ভেড়া গুলো সভ্য জাতির মতো ঘরে ফিরছে।

শিরিন আপার আমন্ত্রনে বিসলারবান থেকে বেরিয়ে, প্রবেশ করলাম শিরিনের কর্মস্থলে। সেখানে প্রবেশ মুখেই চোখে পড়ল ছবি তোলা নিষেধ। এত গোছালো, সুন্দর কোলাহল মুক্ত পরিবেশে স্থান পেয়েছে বিদেশি সংস্থার বেসরকারী এ হাসপাতালটি না দেখলে বোঝায় যেত না। হাসপাতালের ভেতরে প্রবেশ করে কিছুক্ষন অপেক্ষা করার পরে শিরিন আপা নিজের হাতে দু কাপ চা আমাদেরকে এনে দিলেন। চায়ের দেশের সতেজ পাতায় চা চুমুক দিয়ে মন জুড়ালাম। চা শেষ করে বেশিক্ষন সময় নষ্ট না করেই তড়িঘড়ি করে হাসপাতাল থেকে বেড়িয়ে পড়লাম এবং রিকশা ধরে সমশেরনগর বাসট্যান্ড এলাম। এরপরে সিএনজি করে নতুন গন্তব্যে শ্রীমঙ্গল রওনা হলাম।
যেভাবে যাবেন রাজধানী ঢাকা থেকে মৌলভীবাজার যাওয়ার জন্য যেকোন একটি দূরপাল্লার কোচের টিকেট কেটে রওনা দিতে হবে। মৌলভীবাজার পৌছানোর পর বাসট্যান্ড থেকে রিক্সা কিংবা অটোরিকশায় ৩০টাকা খরচ করে চৌমুহনা নামক স্থানে যেতে হবে। পরবর্তীতে চৌমুহনা চার রাস্তা থেকে জনপ্রতি ৫০টাকা ভাড়ায় সিনএনজি করে শমশেরনগর। রিক্সা করে ৩০টাকা ভাড়ায় শমসেরনগর বাজার থেকে ক্যামেলিয়া লেক কিংবা বিসলারবান যেতে হবে।

 

ঢাকা/এআই

POST COMMENT

For post a new comment. You need to login first. Login

COMMENTS(0)

No Comment yet. Be the first :)