শনিবার ৩১ জুলাই ২০২১

১৬ শ্রাবণ ১৪২৮

ই-পেপার

পল্লীকবির ভিটেমাটি

প্রিন্ট সংস্করণ

ফেব্রুয়ারি ২৮,২০২১, ০৬:৫৪

পল্লীকবির ভিটেমাটি

PreviousNext  

“তুমি যাবে ভাই যাবে মোর সাথে আমাদের ছোট গাঁয়

গাছের ছায়ায় লতায় পাতায় উদাসী বনের বায়;

মায়া মমতায় জড়াজড়ি করি

মোর গেহখানি রহিয়াছে ভরি,

মায়ের বুকেতে, বোনের আদরে, ভায়ের স্নেহের ছায়,

তুমি যাবে ভাই- যাবে মোর সাথে আমাদের ছোট গাঁয়।”

 

  পল্লীকবি জসীম উদ্‌দীনের ‘নিমন্ত্রণ’ কবিতাটি মনে আছে? যে গ্রামের সৌন্দর্য উপভোগ করতে কবি এক আকুল আবেদনে নিমন্ত্রণ করেছেন সবাইকে সেখানে। সেই কবিতার ডাকে সাড়া দিয়ে ঘুরে এলাম কবির নিবাস থেকে। কে এই পল্লীকবি? জেনে নেওয়া যাক কবি সম্পর্কিত কিছু তথ্য।

 

তার পুরো নাম জসীম উদ্‌দীন মোল্লা। মোল্লা তার বংশীয় উপাধি। কিন্তু দেশবাসীর ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে কবি তাদের দেওয়া ‘পল্লীকবি’ উপাধিকে করেছিলেন বেশি আপন। তাই ‘পল্লীকবি’ বলে পরিচয় দিতে তিনি বেশি গৌরব বোধ করতেন, আর নামের শেষাংশ ‘মোল্লা’ বাদ দিয়ে দেন। তার ছদ্মনাম হলো ‘তুজম্বর আলি’।

পল্লীকবি জসীম উদ্‌দীনের জন্ম ১ জানুয়ারি ১৯০৩, নিবাস ছিল ফরিদপুর জেলার অম্বিকাপুর গ্রামে। ফরিদপুর জেলা প্রতিষ্ঠিত ১৭৮৬ সালে, আবার অনেকের মতে ১৮১৫ সালে। ফরিদপুর নামকরণ হয়েছে এখানকার সুফি সাধক শাহ শেখ ফরিদুদ্দিনের নামানুসারে। এ জেলার পূর্বনাম ছিল ‘ফতেহাবাদ’।

 

  জসীম উদ্‌দীনের পিতার নাম আনসার উদ্‌দীন মোল্লা, তিনি পেশায় শিক্ষক ছিলেন। মাতা মোসাম্মাৎ আমেনা খাতুন। তিনি গৃহিণী ছিলেন, নকশি কাঁথা ও নকশি পিঠা তৈরিতে পারদর্শী ছিলেন।

 

জসীম উদ্‌দীনের পড়ালেখাটা শুরু হয় অম্বিকা মাস্টারের পাঠশালায় ভর্তির মধ্য দিয়ে। এর কিছুদিন পর এ পাঠশালা ছেড়ে ফরিদপুরের ‘হিতৈষী মধ্য ইংরেজি বিদ্যালয়ে’ ভর্তি হন। তার পিতা এ বিদ্যালয়েই শিক্ষকতা করতেন। সেখানে চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত পড়েন। এরপর ভর্তি হন ফরিদপুর জেলা স্কুলে। সেখান থেকে মেট্রিকুলেশন পাশ করেন। ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজ থেকে তিনি আই.এ. পাশ করেন এবং এ কলেজ থেকেই বি.এ পাশ করেন। জসীম উদ্‌দীন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্ডিয়ান ভার্নাকুলার বিভাগ থেকে বাংলা ভাষায় দ্বিতীয় শ্রেণীতে অষ্টম স্থান অধিকার করে এম.এ পরীক্ষায় পাশ করেন।

কর্মজীবনের শুরুতে জসীম উদ্‌দীন ড. দীনেশচন্দ্র সেনের অধীনে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে রামতনু লাহিড়ী রিসার্চ অ্যাসিট্যান্ট পদে যোগ দেন। এরপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে লেকচারার পদে যোগ দেন। একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনার চাকরি ছেড়ে বঙ্গীয় প্রাদেশিক সরকারের পাবলিসিটি বিভাগের কর্মকর্তা হন।

১৯২১ সালে মোসলেম ভারত পত্রিকায় জসীম উদ্‌দীনের ‘মিলন-গান’ নামে কবিতা প্রকাশিত হয়। এটিই পত্রিকায় প্রকাশিত কবির প্রথম রচনা। ১৯২৫ সালে প্রগতিশীল সাহিত্য পত্রিকা ‘কল্লোলে’ জসীম উদ্‌দীনের বিখ্যাত কবিতা ‘কবর’ প্রকাশিত হয়। সে সময় তার বয়স ছিল ২৩ বছর। ১৯২৭ সালে কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘রাখালী’ প্রকাশিত হয়। এ কাব্যগ্রন্থের প্রতিটি কবিতায় পল্লী ও পল্লীজীবনের কাহিনিগুলো কাব্যরূপে ফুটে উঠেছে।

 

  জসীম উদ্‌দীনের কাব্যে মুগ্ধ হয়ে অনেক স্বনামধন্য ব্যক্তি তার প্রশংসা করতেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার কাব্য সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন, ‘জসীম উদ্‌দীনের কবিতার ভাব-ভাষা ও রস সম্পূর্ণ নতুন ধরণের। প্রকৃত কবির হৃদয় এই লেখকের আছে। অতি সহজে যাদের লিখবার ক্ষমতা নেই এমনতর খাঁটি জিনিস তারা কখনোই লিখতে পারে না।’

 

বিখ্যাত এ কবি তার অতুলনীয় সাহিত্যের জন্য নানা রকম সম্মান পেয়েছেন। ১৯৫৮ সালে জসীম উদ্‌দীন প্রেসিডেন্টের প্রাইড অব পারফরমেন্স পুরস্কার পান। ১৯৬৮ সালে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কবিকে সম্মানসূচক ডক্টর অব লিটারেচার উপাধি দেয়। ১৯৭৬ সালে তাকে একুশে পদক দিয়ে সম্মানিত করা হয়। ১৯৭৮ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারে পান তিনি। তবে ১৯৭৪ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেন।

১৯৭৬ সালের ১৪ মার্চ কবি মৃত্যুবরণ করেন। তার ইচ্ছানুযায়ী তাকে শায়িত করা হয় পারিবারিক কবরস্থানে।

জসীম উদ্‌দীনের বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘নক্সী কাঁথার মাঠ’ যখন পড়েছিলাম তখন থেকেই তার নিবাস দেখবার তীব্র একটা ইচ্ছে ছিল। অবশেষে একদিন হাতে সময় নিয়ে ঢাকা থেকে ফরিদপুর গিয়ে ঘুরে এলাম কবির নিবাস থেকে।

ফরিদপুর শহর থেকে কাছেই কবির বাড়ি। যাওয়ার মাধ্যম অটো, ব্যাটারিচালিত রিকশা। সরু পথ দিয়ে শীতের মিষ্টি বাতাসে অটোতে চড়ে কবির বাড়ির পথে এগুতে দারুণ লাগছিল। ফরিদপুর গোয়ালচামট থেকে ২০-৩০ মিনিটের পথ অতিক্রম করবার পর পৌঁছে গেলাম অম্বিকাপুর গ্রামে যেখানে অবস্থিত কবির বাড়ি।

 

  বাড়িটির শুরুতেই চোখে পড়ে পারিবারিক কবরস্থান, যেখানে শায়িত আছেন কবিসহ তার পরিবারের লোকজন। ঘেরাও করা প্রাচীরে চোখে পড়ে কবির লেখা কাব্যের উদ্ধৃতি। পাশে টিকেট কাউন্টার। বাড়িতে প্রবেশের আগে ২০ টাকা মূল্যের টিকেট কেটে নিতে হয়।

 

গাছ-গাছালিতে সন্নিবেশিত বাড়িটিতে ঢোকার সময়ই দৃষ্টি কেড়ে নেয়। টিকেট কাউন্টারের পাশের একটি স্থানে কবির পরিবারের বিভিন্ন সদস্য, কবির কাছের মানুষের সঙ্গে তোলা ছবি নিয়ে সজ্জিত ফটো গ্যালারি দেখতে পাওয়া যায়। এক কামরাবিশিষ্ট ছোট ছোট ঘরে সজ্জিত বাড়িটির মাঝখানে উঠান রয়েছে। পুরো বাড়িটিতে কবি রচিত বিভিন্ন কবিতার উদ্ধৃতি কিংবা স্মৃতিচারণমূলক বাক্য নজরে পড়ে। কবির জীবনের অনেক মজার স্মৃতি যে জড়িয়ে আছে এ বাড়িটিকে ঘিরে তা আশপাশের দৃশ্যেই বোঝা যায়। কবির স্ত্রীর লাগানো তেঁতুল গাছের বিশাল শাখা-প্রশাখার ছায়াতলে থাকা বাড়িটি যেন এক অনিন্দ্য সৌন্দর্য প্রকাশ করে।

বিভিন্ন স্মৃতিঘর রয়েছে বাড়িটিতে, যেখানে কবি, কবির পিতা-মাতা, স্ত্রী, সন্তান এবং কবির পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের ব্যবহার্য জিনিসপত্র, কবির লেখা বিভিন্ন সাহিত্যের অংশ ইত্যাদি দিয়ে সজ্জিত। বাড়িটিতে একটা ছোট নামাজঘর আছে। গাছের ছায়ায় কেউ যদি দোল খেতে চায় সে ব্যবস্থাও করা আছে।

“এই খানে তোর দাদির কবর ডালিম-গাছের তলে,

তিরিশ বছর ভিজায়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে।

এতটুকু তারে ঘরে এনেছিনু সোনার মতন মুখ,

পুতুলের বিয়ে ভেঙে গেল বলে কেঁদে ভাসাইত বুক।”

 

  উপরের অংশটুকু ‘কবর’ কবিতা থেকে নেওয়া। এ কবিতাটি কমবেশি আমরা সবাই পড়েছি। কবিতাটি পড়বার সময় বুকের মধ্যে যেন একটা হাহাকার কাজ করে। কবির পারিবারিক কবরস্থানের সামনে দাঁড়ালে মনে হয় কবিতার ভাবমূর্তি এ বাড়িকে, এ স্থানকে ঘিরে লেখা। প্রতিটি দৃশ্যই যেন কবিতার একেকটি চরণের ভাবার্থ গভীরভাবে প্রকাশ করছে।

 

জসীম উদ্‌দীনের লেখায় সবসময় গ্রামের সৌন্দর্য, গ্রাম্য মানুষের সুখ-দুঃখে জর্জরিত জীবনকথা, প্রেম-ভালোবাসা উঠে এসেছে। কবির সৃষ্টি সাহিত্য পড়ার সময় পাঠক যেন সে দৃশ্যপট মনের মধ্যে লালন করতে থাকে। কল্পনার জগতে সে পুরো কাহিনিকে অবলোকন করবার চেষ্টা করে। কবির বাড়ি দেখতে গিয়ে মনে হয়েছে, এইতো সেই জায়গা যে জায়গাকে আমি মনের চোখ দিয়ে দেখেছি তার সৃষ্ট সাহিত্য পড়বার সময়।

কবির বাড়ির সামনে রয়েছে মৃতপ্রায় কুমার নদ ও জসীম উদ্‌দীন মঞ্চ। কয়েকটি ছায়াঘর নজরে পড়ে। আগে প্রতি বছর নাকি এখানে জসীম উদ্‌দীন স্মরণে অনুষ্ঠান, মেলা হতো। বর্তমানে তা বন্ধ আছে। কবির বাড়ির পাশে রয়েছে ‘জসীম উদ্‌দীন স্মৃতি যাদুঘর’। কবিপত্নী মমতাজ জসীম উদ্‌দীন ২০০৩ সালে এর ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে ভেতরে প্রবেশ নিষেধ ছিল।

কবির বাড়ি ব্যতীত ফরিদপুর নদী গবেষণা ইনস্টিটিউট, শ্রীধাম শ্রীঅঙ্গন, রাজেন্দ্র কলেজ ও পদ্মার পাড় দেখবার সুযোগ হয়েছিল একদিনের এ ঝটিকা সফরে। ফরিদপুরে কবির বাড়ি দেখতে গেলে গেলে বাগাট ঘোষের মিষ্টান্ন, তেঁতুলতলার খোকা মিঞার মিষ্টি, ভাবীর দোকানের চা আর অনাথের দোকানের আচার খেতে ভুলবেন না মোটেও।

POST COMMENT

For post a new comment. You need to login first. Login

COMMENTS(0)

No Comment yet. Be the first :)