শনিবার ৩১ জুলাই ২০২১

১৬ শ্রাবণ ১৪২৮

ই-পেপার

ফিচার ডেস্ক

প্রিন্ট সংস্করণ

আগস্ট ২২,২০২০, ০৫:২২

একজন সফল নারী উদ্যোক্তা রোকাইয়া সুলতানা

২০১৬ সালে যশোরের অভয়নগরে সর্বপ্রথম উদ্যোক্তা হিসাবে শুরু করেন নিজের অনলাইন ভিত্তিক বুটিক ব্যবসার কার্যক্রম। আজ এলাকার গন্ডি পেরিয়ে সারা বাংলাদেশের পাশাপাশি বেশ কিছু নামি ব্র্যান্ডের শোরুমেও পাওয়া যাচ্ছে তার বুটিকের তৈরি পোশাক।  বলছি ‘শখের কারুকাজের’ স্বত্বাধিকারী এবং যশোরের একজন সফল নারী উদ্যোক্তা, রোকাইয়া সুলতানার কথা।

বোটানিতে অনার্স এবং মাস্টার্সে নিজের ডিপার্টমেন্টে সবচেয়ে বেশি নম্বর পেয়ে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হওয়া, এমনকি খুলনা জেলার মধ্যে নিজের বিষয়ে সর্বাধিক নম্বর পাওয়া রোকাইয়ার ইচ্ছা ছিল একজন সফল সরকারি অথবা বেসরকারি চাকরীজীবি হওয়া। সেইভাবে নিজেকে প্রস্তুত ও করছিলেন তিনি। তারপর বিয়ের পর ২০১৫ সালে হঠাৎ মাইগ্রেনজনিত সমস্যার কারণে চাকরির প্রিপারেশন সংক্রান্ত পড়াশুনা থেকে দূরে সরে আসতে হয় তাকে। কিন্তু রোকাইয়া তো থেমে যাওয়ার পাত্রী নন! আত্ননির্ভরশীলতা অর্জনের প্রত্যয়ে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ রোকাইয়া সুলতানা তাই নিজের শিক্ষা আর যোগ্যতা কে কাজে লাগিয়ে হয়ে ওঠেন একজন সফল নারী উদ্যোক্তা। ২০১৬ সালে ফেসবুকের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করেন তার অনলাইন ভিত্তিক সূচীকর্মের পোশাকের বুটিক ‘শখের কারুকাজ।  ছবিঃ সূচী মাঠকর্মীদের কাজ দেখিয়ে দিচ্ছেন রোকাইয়া সুলতানা

 কিভাবে শুরু হয়েছিল আত্মপ্রত্যয়ী এই নারীর যাত্রা তা জানতে চাইলে রোকাইয়া বলেন, ”প্রথম যখন কিছু একটা করবো এই চিন্তা মাথায় আসে, তখন আমি সারাদিন বাসায় বসে বিভিন্ন কাজের ফাঁকে ইন্টারনেট ঘাটতে থাকি যে কিভাবে তা বাস্তবায়িত করা যায়। তারপর ২০১৬ সালে ফেসবুকে বেশ কিছু ক্ষুদ্র এবং মাঝারি উদ্যোক্তাদের পথচলা দেখে আমিও সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি যে প্রাথমিক ভাবে একটি অনলাইন ফেসবুক পেজের মাধ্যমে শুরু হবে আমার বুটিকের যাত্রা। আর ব্যস, আমি আমার বাবার দেওয়া হাত খরচের টাকা থেকে জমানো মাত্র দেড় হাজার টাকা দিয়ে কিছু জিনিস কিনে শুরু করলাম ‘শখের কারুকাজ।

 ছবিঃ রোকাইয়া আর তার স্বপ্নের সারথীরা

এই বছরের রোজা আর কুরবানি ঈদে শখের কারুকাজ থেকে প্রায় তিন লক্ষাধিক টাকার মতো সেল হয়েছে, যা করোনাকালীন বাস্তবতায় একজন মাঝারি মানের উদ্যোক্তার জন্য অনেক বড় পাওয়া। ইন্টারনেটের মাধ্যমে পণ্যের অর্ডার নিয়ে পৌঁছে দিয়েছেন দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে।

 ছবিঃ মাঠকর্মীরা শখের কারুকাজের জন্য পোশাক তৈরি করছেন

 তবে রোকাইয়ার সফলতার পথ এতোটা মসৃণ ছিল না। প্রতিরোধ এসেছে স্বয়ং নিজের কাছের অনেক মানুষদের থেকেও। রোকাইয়া বলেন, প্রথম প্রথম তো আত্মীয়স্বজন আর প্রতিবেশীদের মধ্যে অনেকেই বলতো যে এতো পড়ালেখা করে শেষে কিনা কাপড় বিক্রি করছে! আমি কিছুটা কষ্ট পেলেও কখনো দমে যাই নি। আমি জানতাম আমি কি চাই! সামাজিক প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি পুঁজিগত স্বল্পতাও ছিল। প্রথমদিকে সব কাজ একাই করতে হতো। এমনকি এলাকার মধ্যে যিনিই পোশাক দেখতে চেয়েছেন, ভারী ব্যাগ বহন করে রোকাইয়া নিজেই দেখিয়ে এসেছেন তার তৈরি করা পোশাক। আস্তে আস্তে কর্মী নিলেন আর সম্পূর্ণ লাভের টাকা ইনভেস্ট করে একটু একটু করে বড় করতে থাকলেন নিজের উদ‍্যোগকে। এখন সারা বংলাদেশে রোকাইয়া সুলতানার বুটিকের তৈরি পণ‍্য ডেলিভারী যায়। তার প্রতিষ্ঠানের আওতায় ১৫২ জন মাঠকর্মী এবং ১৫ জন মাঠ ইনচার্জ কাজ  করেন। তিনি নিজের স্বপ্ন পূরণের পাশাপাশি পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে অনেক দুস্থ ও বেকার নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ ও তৈরি করে দিয়েছেন।

ছবিঃ নিজের ‘শখের কারুকাজ’ বুটিকে রোকাইয়া সুলতানা

 নিজের কাজের পেছনে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রেরণাদায়ী মায়ের কথা স্মরণ করে রোকাইয়া বলেন, ”আমার কাজের পেছনে মা-ই মূলত অনুপ্রেরণা। আসলে সেই অর্থে সূচীশিল্প নিয়ে আমার তেমন কোন ধারণা ছিল না, কিন্তু মা আমাকে হাতে ধরে সব কাজ দেখিয়ে দিয়েছেন। তিনি অনেক ভালো সেলাইয়ের কাজ জানতেন। রোকাইয়া এই যাত্রায় পাশে পেয়েছেন তার জীবনসঙ্গীকে ও। তিনি রোকাইয়ার স্বপ্নকে ডানা মেলতে দিয়ে পাশে থেকে শক্তি যুগিয়েছেন। শখের কারুকাজের ফেসবুক পেজটি তিনি নিজেই খুলে দিয়েছিলেন। আর এখন নিজের কাজের পাশাপাশি স্ত্রীর ব্যবসায় ও সহায়তা করেন। শখের কারুকাজে’ বর্তমানে সূচীশিল্পের পাশাপাশি দেশীয় বাটিক, তাঁতপণ‍্য এবং হ‍্যান্ডপেইন্ট পণ্য ও পাওয়া যায়। সব পণ্য রোকাইয়া নিজেই ডিজাইন করেন।

 ছবিঃ রোকাইয়া নিজেই একজন পোশাককর্মীকে কাজ দেখিয়ে দিচ্ছেন

 রোকাইয়া বলেন, ”নিজে চাকরীতে যেতে না পারলেও আমি অনেকের চাকরীর সুযোগ সৃস্টি করতে পেরেছি । এটাই আমার পাওয়া, আমার উদ‍্যোগের মূলমন্ত্র। শখের কারুকাজকে নিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ ভাবনা সম্পর্কে রোকাইয়া বলেন, “এখন অনলাইনের মাধ্যমে এবং নিজের বাসার একটা রুম কে বুটিকে পরিণত করে কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। আশা আছে, দেশের পাশাপাশি বিদেশেও এক সময় আমার তৈরি পণ্য যাবে। সুই-সূতোর ফোড়ে আমি প্রতিনিয়ত নিজের স্বপ্নকে বুনে চলেছি।

 ছবিঃ নিজের বুটিকে কর্মরত রোকাইয়া সুলতানা

রোকাইয়া সুলতানার মতো নারী উদ্যোক্তা দেখিয়ে দিয়েছেন কিভাবে সমাজ ও ব্যক্তিগত জীবনে বিদ্যমান নানা প্রতিকূলতাকে জয় করে একজন সফল  উদ্যোক্তা হওয়া যায়। তার এই সফলতার কাহিনী আশা জাগাবে দেশের আরও লক্ষ লক্ষ স্বপ্নবান নারী উদ্যোক্তাদের।

POST COMMENT

For post a new comment. You need to login first. Login

COMMENTS(0)

No Comment yet. Be the first :)